ডেস্ক নিউজ : রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে নতুনভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সামি হামদি।
তিনি বলেছেন, শুধু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এর জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন।
রবিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা হলে আয়োজিত ‘মুভ টাউন হল: বিয়ন্ড দ্য ক্যাম্পস-বাংলাদেশ অ্যাজ দ্য আর্কিটেক্ট অব রোহিঙ্গা রিটার্ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সামি হামদি। অনুষ্ঠানটি হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএর অংশীদারত্বে আয়োজিত হয়।
সামি হামদি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ বর্তমানে মূলত মানবিক সংকট হিসেবে মোকাবিলা করছে। কিন্তু এটি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই এখন থেকেই বাংলাদেশকে নিজস্ব রাজনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘কূটনীতি একা যথেষ্ট নয়। কূটনীতি যথেষ্ট হলে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করত না।’
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো আলোচনা হলে সেখানে বাংলাদেশের ভূমিকা কতটা থাকবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ এখন থেকেই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগতভাবে কাজ না করলে ভবিষ্যতের আলোচনায় নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার পরামর্শ তিনি দেন। এমনকি উত্তর রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আঞ্চলিক শান্তিরক্ষী বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাবনাও তুলে ধরেন তিনি।
সামি হামদি বলেন, ‘বাংলাদেশ শুধু এমন একটি দেশ নয়, যে একটি সমস্যার বোঝা বহন করছে। রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো নতুন করে চিন্তা করার সক্ষমতা। আমরা আবার স্বপ্ন দেখতে পারি কি না, সেটিই প্রশ্ন।’
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক ধারণার সমালোচনা করে হামদি বলেন, রোহিঙ্গাদের শুধু ‘বোঝা’ হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যায়। তাঁদের শিক্ষা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং নিজেদের কণ্ঠ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মুসলিম এইডের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এবং ইসলামিক রিলিফ অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাদলুল্লাহ উইলমট। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিক্ষা, খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণেও ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটের ভার বহনের বিষয়টি তুলে ধরে উইলমট বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে, তবে তাঁদের এমন পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে আবারও নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি-নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ এবং আইনগত অধিকার।
জমি ও সম্পত্তি হারানোর ক্ষতিপূরণ এবং চলাচল, শিক্ষা ও কাজের অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে উইলমট বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও বিভিন্নভাবে চাপের মুখে পড়ছে। তাই মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে শরণার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট মাহমুদ হাসান রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা শুধু একটি ‘সংকট’ নয়, তাঁরা মানুষ। তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহমুদ হাসান বলেন, তিনি ২০১৬ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে চলে আসেন। পরের বছর তাঁর মা বাংলাদেশে আসেন। মিয়ানমারে শিক্ষার্থী, নেতা, বুদ্ধিজীবী ও নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলা ব্যক্তিদের ওপর দমন-পীড়নের কারণে তাঁদের মতো অনেক পরিবারকে দেশ ছাড়তে হয়েছে বলে তিনি জানান।
মাহমুদ হাসান বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভুল ইতিহাস ও নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। “তারা যদি বই লিখে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করতে পারে, তাহলে আমরা ভালো মানুষরা কী করছি? আমরা কেন আমাদের কণ্ঠ আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে পারছি না?”
রোহিঙ্গা তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত হতে হলে রোহিঙ্গাদের নিজেদের নেতৃত্ব ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব, বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা, রোহিঙ্গাদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সংকট সমাধানে নতুন প্রজন্মের।
<p style="text-align: center;">প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ শিহাব উদ্দিন</p><p style="text-align: center;">ফোন নাম্বারঃ 01711475448</p><p style="text-align: center;">জিমেইলঃ Dainikbanglasomoy@gmail.com</p><p style="text-align: center; ">সম্পাদকীয়ঃ ৫১৬/2 ইসিবি চত্বর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। ঢাকা ১২০৬</p>
Copyright © 2025 All rights reserved